শিল্পকারখানা গুলো মানবসভ্যতার বাস্তব নিদর্শন। দিন যত এগিয়েছে শিল্পকারখানার আকার আরও বিশাল থেকে বিশালতর হয়েছে। তৈরি হচ্ছে নানান পন্যসামগ্রী যা আমাদের জীবঙ্কে করে তুলছে আরও আধুনিক আর উন্নত। কিন্তু এই শিল্পকারখানা থেকেই ঘটে গেছে ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা যা কেড়ে নিয়েছে মানুষের জীবন আর তার গড়ে তোলা সম্পদ। ইতিহাসের এই কালো ঘটনা গুলোর বর্ণনা নিয়েই এই সিরিজ। তো শুরু করা যাক।

Piper Alpha যাত্রা শুরু করে ১৯৭৬ সালে। এর অবস্থান ছিল স্কটল্যান্ডের Aberdeen শহর থেকে প্রায় ১৯০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে উত্তর সাগরে। Occidental Petroleum Limited এর আওতাধীন অর্ধেকের বেশি পানিতে নিমজ্জিত প্রায় ২৩০ মিটার উঁচু এই Oil Rig ১৮৫ কিমি/ঘন্টা বাতাস আর ২৮.৫ মিটার ঢেউয়ে টিকে থাকতে সক্ষম ছিল। পুরো প্ল্যাটফর্ম চালু রাখতে কর্মরত ছিল ২২৬ জন। কার্যদিবস ২৪ ঘণ্টা সপ্তাহে ৭দিন।

পুরো রিগ ৪ টি মডিউলে বিভক্ত-

মডিউল এঃ Oil Piping

মডিউল বি এবং মডিউল সিঃ তেল-গ্যাস প্রসেসিং

মডিউল ডিঃ Power Generation

এগুলোর উপর লিভিং ব্লক যেখানে রেস্তোরাঁ আর হেলিপ্যাড ও ছিল।

Piper Alpha এর কাঠামো (ScienceDirect)

১৯৭৬ সালে উৎপাদনের হার ছিল ২৫০০০০ Barrel per Day যা ১৯৮৮ সালে ছিল ১২৫০০০ Barrel per Day. Piper Alpha এর সাথে আরও দুইটি প্ল্যাটফর্ম সংযুক্ত ছিল Claymore আর Tartan.

Piper Alpha ও তার আশেপাশের পাইপিং সিস্টেম (ScienceDirect)

৬ জুলাই, ১৯৮৮

সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটঃ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য অনুমতি দেয়া হয় Pump A এর মেরামত কাজ করা হবে

দুপুর ১২টাঃ দুইটা কনডেনসেট (Liquified Petroleum Gas বা LPG) পাম্পের (Pump A এবং B) ভিতর Pump A রক্ষণাবেক্ষণের জন্য খুলে ফেলা হয় এর প্রেশার সেফটি ভাল্ভ (PSV #504) সরিয়ে ফেলা হয় সেফটি ভাল্ভের জায়গায় অস্থায়ী সমতল ধাতব চাকতি (Blank Flange) বসিয়ে সিল করে দেয়া হয় কিন্তু এটার স্ক্রগুলো হাত দিয়ে আটকানো হয় সন্ধ্যা ৬ টা বেজে গেলেও কাজ শেষ হয় নি অর্থাৎ পরদিন সকাল পর্যন্ত পাম্পটা অফ ডিউটি থাকবে অনডিউটি ইঞ্জিনিয়ার Pump A ব্যবহারযোগ্য না লিখে আরেকটি পারমিট সই করেন (এটা রক্ষণাবেক্ষণ কাজের অনুমতি পত্র না এবং অন্য বাক্সে রাখা ছিল)

সন্ধ্যা ৬ টাঃ একটা শিফট শেষ হয় রাতের শিফটে ৬২ জন কাজ করা শুরু করে কিন্তু Pump A এর অবস্থা সম্পর্কে পরের শিফটের অপারেটরকে জানানো হয়নি শুধু রক্ষণাবেক্ষণ কাজের অনুমতিপত্র সেখানে রাখা ছিল

রাত ৯ টা ৪৫ মিনিটঃ মিথানল সিস্টেমে সমস্যার কারনে মিথেন ক্ল্যাথরেট গ্যাস কমপ্রেশন সিস্টেমে জমা হতে থাকে এর ফলে Pump B বাঁধাগ্রস্ত হয় কাজ করা বন্ধ করে দেয় এটাকে চালু করা গেল না কিন্তু এটার উপর পুরো প্ল্যাটফরমের পাওয়ার সাপ্লাই এর উপর নির্ভরশীল খুব অল্প সময়ের ভিতর চালু করতে না পারলে স্টোরেজ ট্যাঙ্ক ভর্তি হয়ে যাবে এবং স্বয়ংক্রিয় ভাবে পুরো তেল উত্তোলন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে এটা কোনভাবেই কাম্য না আরেকটা পাম্প ব্যবহার করলেই এই সমস্যা সমাধান হওয়ার কথা কিন্তু Pump A খুলে রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য রাখা হয়েছিল তাই পাম্প ব্যবহার করা যাবে কিনা যাচাই করা হচ্ছিল কিন্তু ভিন্ন বাক্সে থাকার কারনে Pump A এর অবস্থা সংক্রান্ত দলিলটা নজরে আসে নি ধরে নেয়া হয়, Pump A ব্যবহারযোগ্য এখানে উল্লেখ্য যে, দলিল গুলো মেশিন বা পার্টসের অবস্থান অনুসারে রাখা হত ভাল্ভ আর পাম্পের অবস্থান ছিল ভিন্ন জায়গায়

রাত ৯ টা ৫২ মিনিটঃ Pump A চালু করা হয় কোন সেফটি ভাল্ভ ছাড়াই সুতরাং চাপের কারনে হাল্কাভাবে লাগানো ধাতব ডিস্ক দিয়ে গ্যাস বের হতে থাকে

রাত ৯টা ৫৫ মিনিটঃ গ্যাস প্রথম অ্যালার্ম বেজে ওঠে কিছু বুঝে ওঠার আগেই উচ্চ মাত্রার আরও ৫৬ টা অ্যালার্ম একযোগে বাজতে শুরু করে হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে অপারেটর এমারজেন্সি সুইচে চাপ দিয়ে পুরো প্লান্ট অফ করে দেন সবকিছু ঠিক থাকলে আর কোন সমস্যা হবার কথা না, যেহেতু তেল আর গ্যাসে প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে বিস্ফোরণ যে কম্পারটমেন্টে ঘটে তার দেয়াল ৮ × ৫ ফিট প্যানেল দিয়ে ঢাকা ছিল এটা অগ্নি নিরোধক ছিল কিন্তু বিস্ফোরণ থামানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না যার কারনে ভারি প্যানেল গুলো ছিটকে পাশের মডিউল গুলোয় আছড়ে পড়ে অনেকটা অনিয়ন্ত্রিত মিসাইলের মত ভাঙ্গা প্যানেলের আঘাতে একটা কনডেনসেট পাইপ ফেটে যায় ফলে আবার আগুন ধরে যায়

রাত ১০ টা ৪ মিনিটঃ প্রচন্ড ধোঁয়ার কারনে কন্ট্রোল রুম ছাড়তে বাধ্য হয় অপারেটর পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে

রাত ১০ টা ২০ মিনিটঃ দ্বিতীয় বিস্ফোরণ ঘটে এটা প্রথমটির চেয়ে কয়েকগুন বেশি শক্তিশালী। প্রায় শতাধিক কর্মী ক্যাফেটেরিয়ায় জড় হয় কারন এটা ছিল হেলিপ্যাডের একদম নিচে। কিন্তু দুরভাগ্যজনক ভাবে ঐদিন হেলিপ্যাডের চারদিক আগুন ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়ায় হেলিকপ্টার নামানো সম্ভব ছিল না। দুই জন অগ্নিরোধক পোশাক পরে নিচে নামে অগ্নি নির্বাপণ সিস্টেম চালু করার জন্য। তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় নি। এদিকে বিস্ফোরণ দেখে রেস্কিউ বোট আসা শুরু করে

১০ টা ৫০ মিনিটঃ আবারও বিস্ফোরণ ঘটে এটা এতই শক্তিশালী ছিল যে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরের জাহাজ থেকেও এর কম্পন অনুভূত হয় ইতিমধ্যে কিছু কর্মী সমুদ্রে লাফ দিয়ে রেস্কিউ বোটে উঠতে সক্ষম হয়। কিন্তু বেশিরভাগ তখনও আটকা। প্রায় শতাধিক লোক লিভিং ব্লকে হেলিকপ্টারের অপেক্ষায়

রাত ১১ টা ২০ মিনিটঃ শেষ বিস্ফোরণ ঘটে। পুরো প্ল্যাটফর্ম কাঁপা শুরু করে। ক্রেন ভেঙ্গে পড়ে। পুরো প্ল্যাটফর্ম পূর্ব দিকে হেলে পড়ে। লিভিং ব্লক উত্তর দিক থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এবং  এতে অবস্থানরত কর্মীদের সহ ১৭৫ ফিট উপর থেকে সাগরে পড়ে যায়। সাথে হেলিপ্যাডও পড়ে যায়। ভিতরে থাকা সবাই উত্তর সাগরের পানিতে ডুবে মারা যায় ১২ টা ৪৫ এর ভিতর বাকি প্ল্যাটফর্মও সাগরে ভেঙ্গে পড়ে। দাঁড়িয়ে থাকে মডিউল এ এর কিছু অংশ।

দুর্ঘটনার পর দাঁড়িয়ে থাকা মডিউল এর কিছু অংশ (BBC)

Piper Alpha এর ২২৬ জন কর্মীর মধ্যে ১৬৫ জন প্রাণ হারান আর বেঁচে ফেরে ৬১ জন। বেশিরভাগই পানিতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বাঁচান। সাগরে ডুবে থাকা লিভিং ব্লক থেকে থেকে ৮১ টি লাশ উদ্ধার করা হয়।

দুর্ঘটনার কারনঃ অনুসন্ধানের জন্য ৮৯ জন বিশেষজ্ঞ সহ Cullen Inquiry কমিটি গঠন করা হয়। মডিউল সি তে প্রথম আগুন লাগে কনডেনসেট থেকে। এটা নিশ্চিত হয় প্রথম বিস্ফোরণের ছবি আর প্রত্যক্ষদর্শীদের থেকে পাওয়া নীল রঙের শিখা থেকেPiper Alpha থেকে প্রধানত তিন ধরনের পেট্রোলিয়াম উৎপাদন করা হত

. LPG (Liquified Petroleum Gas) বা কনডেনসেট

. Natural Gas

৩. Crude Oil

কনডেনসেট ভারি আর তাই প্ল্যাটফর্মের নিচ থেকে আগুন দেখা যায়। গ্যাস হালকা আর তেলের শিখা অন্যরকম ঢিলাভাবে লাগানো সেই ধাতব ডিস্ক থেকেই কনডেনসেট বের হয় আর ঘটনার শুরু এখানেই। কিন্তু কনডেনসেট থেকে বিস্ফোরণ হলেও এর মাত্রা পুরো প্ল্যাটফর্ম ভাঙ্গার জন্য মোটেও যথেষ্ট না আর ভারি কনডেনসেট নিচে পড়ে যাওয়ার কথা এবং আর কোন বিস্ফোরণ হওয়ার কথা না তাহলে?

মডিউল সি এর দেয়াল অগ্নি নিরোধক হলেও বিস্ফোরণ নিরোধক ছিল না। ফলে এগুলো ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে পাশের মডিউল বি তে আছড়ে পড়ে। একটি কনডেনসেট পাইপ ধাতব টুকরার আঘাতে ভেঙ্গে যায় এবং আগুন ধরে যায়। এখানে কমপক্ষে ৫৫ টন Crude Oil রাখা ছিল ফলে দ্বিতীয় বিস্ফোরণ ঘটে যা কালো ধোঁয়া থেকে স্পষ্ট হয়। মডিউল বি এর নিচে যাতায়াতের জন্য লোহার গ্রিড ছিল যারমাঝ দিয়ে তেল নিচে পড়ে যাবার কথা। কিন্তু গ্রিডের উপর রাবার ম্যাট দিয়ে ঢাকা ছিল। এর কারনে তেল ওখানে জমা হয় এবং জ্বলতে থাকে। এই জায়গা দিয়ে পার্শ্ববর্তী Tartan প্ল্যাটফর্ম থেকে আসা ১২০ atm চাপে চালু থাকা গ্যাস পাইপ লাইন চলে গিয়েছিল প্রচন্ড তাপে পাইপের গ্যাসের চাপ বাড়তে থাকে আর পাইপ তাপে দুর্বল হয়ে পড়ে ফলে পাইপ ফেটে যায় এবং কয়েক টন (প্রতি সেকেন্ডে প্রায় আধা টন) গ্যাস প্রছন্ড চাপে বের হয়ে বিস্ফোরণ ঘটায়। এরপর আর ফিরে আসার কোন সুযোগ ছিল না। পার্শ্ববর্তী Claymore প্ল্যাটফর্ম থেকে আসা আরও একটা পাইপ ফেটে যায় এবং শেষ বিস্ফোরণ ঘটে প্রায় পুরো প্ল্যাটফর্ম ধ্বসে পড়ে।

আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি পুরো ঘটনার শুরু একটা Paper Work থেকে PTW বা Permit to Work এমনভাবে ডিজাইন করা যাতে রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কথা সবার জানা থাকে। আর সেফটি ভাল্ভ সরানোর পর ও অভিজ্ঞ কর্মীদের পাম্প চালু করার কথা না। সকাল ৭ টা ৪৫ এ পাম্প সারাই করা হবে এই জন্য PTW দেয়া হয় আর সেফটি ভাল্ভ নিয়ে আরেকটি আলাদা PTW দেয়া হয় দুইটি আলাদা মডিউলের কাজ তাই আলাদা বাক্সে রাখা ছিল ফলে অপারেটর যখন Pump A চালু করার নির্দেশ দেন তখন শুধু প্রথম PTW দেখেন আর এখান থেকেই ঘটনার শুরু। আলাদা PTW এর প্রমাণ মেলে ডুবে যাওয়া লিভিং ব্লক থেকে কাগজ উদ্ধারের পর

Cullen কমিটি তাদের রিপোর্টে Safety Procedure সংক্রান্ত প্রায় ১০৬ টা রিকমেন্ডেশন দেয় তার মধ্যে অন্যতম ছিল Department of Energy থেকে সেফটি সংক্রান্ত বিষয়গুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব Health and Safety Executive কে দেয়া

ত্রুটি পূর্ণ PTW এর কারনে ঘটে গেল ইতিহাসের অন্যতম বড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল দুর্ঘটনা পাম্পে কাজ করতে হলে পাম্প সংক্রান্ত কাগজ সবগুলো বক্সে চেক করলে হয়ত দুর্ঘটনা ঘটত না কিংবা রাবার ম্যাট না থাকলে হয়ত শেষ বিস্ফোরণ গুলো হত না মডিউল সি এর দেয়াল বিস্ফোরণরোধী হলে হয়ত ওখানেই ঘটনা থেমে যেত কিংবা হেলিপ্যাডটা নিরাপদ থাকলে হয়ত লিভিং ব্লকের সবাই বেঁচে যেত

পুরো ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি হয় ১.৭ বিলিয়ন USD. ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় Occidental কে তাদের ত্রুটিপূর্ণ সিস্টেমের জন্য দায়ী করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন চার্জ আনা হয়নি

তথ্য ও ছবিঃ

Science Direct

National Geographic Channel

BBC

Wikipedia

To read more articles like this, visit: blog.bohubrihi.com

This Post Has One Comment

  1. Hey there! I know this is kind of off-topic however I needed to ask. Does building a well-established blog such as yours require a large amount of work? I’m completely new to blogging but I do write in my journal on a daily basis. I’d like to start a blog so I will be able to share my experience and views online. Please let me know if you have any kind of ideas or tips for new aspiring blog owners. Thankyou!|

Leave a Reply